মেমসাহেবঃ অন্ধপ্রেম, নারীরূপ ও অসংখ্য চিঠি

সাংবাদিক বাচ্চু লিখত পত্রিকায় আর তার জীবনের গল্পের লেখিকা হিসেবে সহসাই মেমসাহেবের আবির্ভাব। ধ্রুপদী প্রেমের নিতান্ত সরল গল্পেও লুকিয়ে আছে না পাঠানো অসংখ্য চিঠি।

“প্রহর শেষের আলোয় রাঙা সেদিন চৈত্র মাস –
তোমার চোখে দেখেছিলাম আমার সর্বনাশ।
এ সংসারে নিত্য খেলায় প্রতিদিনের প্রাণের মেলায়
বাটে ঘাটে হাজার লোকের হাস্য-পরিহাস 
মাঝখানে তার তোমার চোখে আমার সর্বনাশ। “

রবীন্দ্রনাথের এই চার লাইন অসংখ্য ধ্রুপদী প্রেমের গল্পের শুরুর সাক্ষী। নিমাই ভট্টাচার্যের লেখা মেমসাহেব ও এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম নয়। সেই চিরাচরিত ট্রেনের কোন কামরায় উপন্যাসের প্রধান দুই চরিত্র সাংবাদিক বাচ্চু আর মেমসাহেবের প্রথম দেখা হয়।

বইয়ের বাকি অংশটুকুও একইরকম গতানুগতিক কি না সে নিয়ে বিস্তর বিতর্কের খুব একটা অবকাশ নেই। এ বইয়ের প্রথম থেকে শেষ অবধি সরলপথেই এগোয়। তবু সাবলীল বাচনভঙ্গি, প্রেমের অপূর্ব বিবরণ আর তৎকালীন সামাজিক-অর্থনৈতিক অবস্থার চিত্র বাংলায় রচিত প্রেমের উপন্যাসের তালিকায় মেমসাহেব কে উপরের দিকেই রাখে।  

লেখক জীবনের প্রতিফলন

বইয়ের লেখক নিমাই ভট্টাচার্য ব্যক্তিজীবনে সাংবাদিক ছিলেন। নানা রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ঘটনার পরিক্রমায় তার অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার বেশ সমৃদ্ধ। ১৯৬৪ সালে লেখকের প্রথম বই বের হলেও ১৯৬৮ সালে মেমসাহেব প্রকাশিত হবার পর তিনি পাঠকসমাজে জনপ্রিয়তা অর্জন করেন।

লেখকের মতই উপন্যাসের প্রধান চরিত্র একজন পঞ্চাশ টাকা বেতনের সাংবাদিক। অনেকের মতে, বাচ্চুর মধ্য দিয়ে লেখক নিজের ঘটনাবহুল জীবনের কিছু অংশ তুলে ধরেছেন। ছোটবেলায় মা কে হারানো বাচ্চু কখনোই সেভাবে নারীচরিত্রের সংস্পর্শে আসেনি, তাই নারী চরিত্র সবসময় ই অভেদ্য রহস্য হয়ে ছিল।

জীবনের একেক পর্যায়ে বাচ্চুর সঙ্গে এসব নারী চরিত্রদের আলাপ-পরিচয়ের গল্পগুলোই নিখুঁত বর্ণ্নায় চিঠি আকারে বাচ্চু তার দোলাবৌদিকে পাঠাত।

পুরো উপন্যাসটাকে বলা যায় অনেকগুলো চিঠির সংকলন। যে চিঠির চল আজ বিলুপ্তপ্রায় সেই চিঠির সৌন্দর্য বহুলভাবে এ উপন্যাসে প্রকাশিত।

চিঠির রসাত্মক ও নিখুঁত বাচনভঙ্গির কারণে উপন্যাসের নিতান্ত সাধারণ কিছু বর্ণ্নাও কেমন অসাধারণ হয়ে ওঠে। ঠিক একই কারণে চিঠি চরিত্রগুলোও অনেক বেশি জীবন্ত!

পটভূমি ও মৃদু ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক

উপন্যাসটি ৪৭ এর দেশভাগের পরবর্তী সময়কালীন পটভূমিতে রচিত। সেসময়কার অনিশ্চিত আর্থ-সামাজিক অবস্থা, স্বপ্ন আর বাস্তবতার ক্রমাগত লড়াই এ উপন্যাসে স্পষ্ট। লাখ লাখ যুবককে সহসাই বাস্তবতা যেন আঘাত করে। ক্ষতবিক্ষত তরুণ সমাজ চাকরির নেশায় উন্মত্ত।

এই সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা অনেকটা ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের মত বাজছিল এ বইয়ে। যার কিছুটা আঁচ পাওয়া যায় বাচ্চুর সাংবাদিকতার কারণে। এই হতভাগ্য যুবকদের ই একজন বাচ্চুর নিজের জীবন নিয়ে তেমন উচ্চাশা ছিল না। তবে মেমসাহেবের সঙ্গে দেখা হবার পর বাচ্চুর জীবনে আমূল পরিবর্তন আসতে শুরু করে।

সংসার ধর্মই বড় ধর্ম

তৎকালীন সময়ের নব্য মডার্নিজম, ব্রিটিশ চালচলন আর চিরাচরিত বাঙালি সংস্কৃতির দ্বন্দ্বও খুব সূক্ষ্মভাবে লেখক ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন। কিন্তু, লেখক গতানুগতিকতার বাইরে কিছু করেননি কিংবা করতে চাননি। মেমসাহেব কলেজে অধ্যাপনা করলেও তার চরিত্র বিশ্লেষণে বিশেষ কিছু ফুটে ওঠে না।

কলেজের অধ্যাপিকা হওয়া সত্ত্বেও তার নিজের জগত বলে কিছু ছিল না। ভালোবাসায় একে অপরের পরিপূরক হওয়া যেখানে বাঞ্ছনীয় সেখানে একতরফা ভাবে বাচ্চুর দিকেই পাল্লাটা ভারী। উচ্চ শিক্ষিতা হওয়া সত্ত্বেও মেমসাহেবের লক্ষ্য ভবিষ্যতে সংসার সামলানো আর বাচ্চুকে আকুণ্ঠ সমর্থন জানানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। আমার মনে হয়, বইয়ের পটভূমি অনুসারে মেমসাহেবের চরিত্রে অনেক ভিন্নমাত্রা সংযুক্ত করা যেত।

কফি, এক্সিবিশন ও পারস্পরিক কবিতা বিনিময়

অন্ধপ্রেমের প্রকৃষ্ট উদাহরণ বলা যেতে পারে এই উপন্যাসকে। দোলাবৌদিকে লেখা প্রত্যেক চিঠিতে প্রায় পুরোটা জুড়ে কেবল মেমসাহেবের সঙ্গে কাটানো সময়ের বর্ণনা ছিল। বাচ্চু আর মেমসাহেবের প্রেমের বর্ণনা কেবল জীবন্ত নয়, অসম্ভব সুন্দর।

প্রেমের দুটি মূল স্তম্ভ পারস্পরিক বিশ্বাস আর সম্মানের দুর্দান্ত নিদর্শন বাচ্চু আর মেমসাহেব। প্রেমের উপন্যাস হলেও যৌনতার খোলামেলা কোন বর্ণনায় লেখক যাননি বরং প্রত্যেকবার দক্ষতার সঙ্গে মানসিক প্রেমকে সবকিছুর ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছেন। শহরের স্ট্রিটে একসঙ্গে হাঁটা, পুরো পৃথিবীকে ফাঁকি দিয়ে অন্তরঙ্গ হতে চাওয়া,  পারিবারিক সম্পর্ক, সংস্কৃতি – সব মিলিয়ে রোমান্স প্রেমিকদের জন্যে বেশ সুখপাঠ্য একটি বই।

মেমসাহেব কেন পড়ব?

রোমান্স ঘরানার বই যদি আপনার পছন্দের হয়, তাহলে এ বই আপনার ভালো লাগবে বলে আমি মনে করি। বাকিরাও পড়ে দেখতে পারেন। উপন্যাসের গল্প সরলপথে এগোলেও নিমাই ভট্টাচার্যের অনবদ্য লেখনশৈলী আপনাকে মুগ্ধ করতে বাধ্য। ১৫৬ পৃষ্ঠার বই এক বসাতেই পড়ে ফেলতে পারবেন।

আর হ্যাঁ, ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের কথা বলছিলাম, মাঝে মাঝে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক কিন্তু বেশ তীব্র হয়ে ওঠে, তাই না? সেসময় কান পাতা সত্যি দায়!